আমার টেলিগ্রাম গ্রুপের Statistics অনুযায়ী দেখলাম গড়ে ৬০০+- অভিভাবক আমার পোস্টগুলো নিয়মিত পড়েন। বাকি সদস্যরা মাঝে মাঝে পড়েন আবার অনেকেই আনএক্টিভ। এর একটা বড় কারণ অনেকেই গ্রুপগুলোতে এড হয়ে থাকেন পড়ার সময় পান না আবার অনেকেই আমার লেখাগুলো বড় দেখে ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন। তাদের জন্য কিছু কথা...
সম্মানিত অভিভাবক, অফিস থেকে ফেরার পথে বা রান্নাঘরের কাজ শেষ করে ক্লান্ত শরীরে আমরা যখন ফেসবুকের টাইমলাইন স্ক্রল করি, চোখের সামনে ভেসে ওঠে নানান চটকদার টিপস এন্ড ট্রিকস। হঠাৎ এমনি-ই একদিন দুই লাইনের একটা সুন্দর কোটেশন কিংবা ৪০-৫০ সেকেন্ডের কোন রিলস চোখে পড়ল। দেখতে বড্ড আকর্ষণীয় লাগলো।
আপনার মন অবচেতনভাবেই ভাবা শুরু করল, আহা! সন্তানকে মানুষ করার জাদুকরী চাবিকাঠি তো পেয়ে গেলাম।
এভাবেই আমরা পুরো বিষয়টি একটুও তলিয়ে না দেখে, এর পেছনের মনস্তত্ত্ব না বুঝে, অন্ধের মতো সেই ছোট্ট দুই লাইনের ‘টিপস’ নিজের সন্তানের ওপর অ্যাপ্লাই করা শুরু করে দেই।
কিন্তু একটু ভেবে বলুন তো, একটা জলজ্যান্ত মানুষের মনস্তত্ত্ব কি ছোট্ট দুই লাইনের ফেসবুক ক্যাপশন কিংবা রিলসে নিখুঁতভাবে ফ্রেমবন্দি করা সম্ভব?
চাইল্ড সাইকোলজির একটা গভীর সত্য আপনাদের বলি। একটা শিশুর মন কোনো যান্ত্রিক রোবট নয় যে আপনি একটা রেডিমেড কমান্ড সেট করে দিলেন আর সে সেই অনুযায়ী নিখুঁতভাবে চলবে। শিশুরা শিখে পরিস্থিতি দেখে, আমাদের আচরণের পেছনের আবেগটা অনুভব করে।
যখন কোনো লেখক বা গবেষক একটা বই লেখেন, তখন তিনি একটা ধারণার পেছনে পাতার পর পাতা খরচ করেন। তার আলো-আঁধারি, তার প্রেক্ষাপট (Context) সবকিছু বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু আমরা ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে সেই মূল আলোচনাটুকু না পড়ে, সেখান থেকে কেটে নেওয়া এক চিলতে চুম্বক অংশ বা সোশ্যাল মিডিয়ার রিলস-ভিডিও দেখে পুরো ‘সন্তান প্রতিপালন’ শুরু করে দেই।
এর ফলাফল কী হয় জানেন? একটা মারাত্মক হিতে বিপরীত পরিস্থিতি।
ধরুন, আপনি কোনো বইয়ে বা ইন্টারনেটে একটা চমৎকার রিলসে টিপস দেখলেন, “সন্তানকে অপেক্ষা করতে শেখান, এতে তার ধৈর্য বাড়ে।”
চাইল্ড সাইকোলজিস্টরা হয়তো বইয়ের পরের পাতায় বিস্তারিত লিখেছেন যে কখন অপেক্ষা করাতে হবে আর কখন চাওয়া মাত্রই দিতে হবে। কিন্তু আপনি শুধু ওই প্রথম লাইনটাই মাথায় গেঁথে নিলেন।
পরদিন আপনার সন্তানের পরীক্ষা। তার একটা জ্যামিতি বক্স লাগবে কিংবা স্কুলের পরীক্ষার ফি জমা দেওয়ার শেষ দিন আজ। সে এসে আপনাকে বলল, আব্বু/আম্মু, আমার এই জিনিসটা খুব জরুরি লাগবে।
এখন আপনার মাথায় তো তখন ঘুরছে সেই জনপ্রিয় প্যারেন্টিং টিপস—সন্তানকে সাথে সাথে কিছু দেওয়া যাবে না, অপেক্ষা শেখাতে হবে!
আপনি আপনার মনকে বোঝালেন, আজকে যদি ওকে একটু কষ্ট না দেই, ও তো ধৈর্যের মূল্য বুঝবে না। আপনি তাকে বললেন, এখন না, পরে দেখা যাবে।
একবার ভেবে দেখেছেন ওই মুহূর্তে ওই ছোট্ট শিশুটার মনের ভেতর কী ঝড় বয়ে যাচ্ছে? ও কিন্তু আপনার ওই ধৈর্য শিক্ষার মহৎ বাণী বুঝতে পারছে না। কারণ ওই মুহূর্তে তার জিনিসটার সত্যিই দরকার।
চাইল্ড সাইকোলজির ভাষায়, এই তীব্র প্রয়োজনীয় মুহূর্তে যখন একটা শিশু তার মা-বাবার কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়, তখন তার ভেতর এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। সে ভাবতে শুরু করে, আমার যখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখনো আমার মা-বাবা আমার পাশে থাকে না। আমার পড়াশোনা বা আমার আবেগ বোধহয় তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।
এই যে একটা ভুল বার্তা আপনি তার অবচেতন মনে ঢুকিয়ে দিলেন, এর মাশুল কিন্তু অনেক বড়। যে সন্তানকে আপনি ধৈর্যশীল বানাতে চেয়েছিলেন, সে উল্টো জেদি, একাকী এবং মা-বাবার প্রতি ক্ষুব্ধ এক নাগরিকে পরিণত হতে শুরু করে। আপনার অজান্তেই আপনার এতদিনের সুন্দর প্যারেন্টিং জার্নিটা একটা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে গেল।
🌳 সমাধান কোথায়?
তাহলে কি টিপসগুলো ভুল? না, টিপসটা ভুল ছিল না। ভুল ছিল আমাদের অর্ধেক জানার খামখেয়ালিপনা। আর যারা এমন ছোট ছোট রিলস ছাড়ে তাদের দূর্বলতা। আমরা যদি বিষয়টার গভীরে যেতাম, তবে বুঝতাম চাইল্ড সাইকোলজিতে শিশুর চাওয়াকে দুটো ভাগে ভাগ করা হয়:
অপরিহার্য প্রয়োজন (Needs):
শিশুর শিক্ষা, সুস্বাস্থ্য, মৌলিক অধিকার এবং মানসিক নিরাপত্তার সাথে জড়িত বিষয়গুলো হলো তার 'নিডস'। পরীক্ষার ফি, খাতা-কলম, অসুস্থতায় ডাক্তারের কাছে যাওয়া কিংবা সে যখন ভীষণ একা বোধ করে আপনার বুকে জড়িয়ে ধরতে চায়, এগুলো চাওয়া মাত্রই, কোনো বিলম্ব না করে পূরণ করতে হবে। এখানে অপেক্ষা শেখাতে যাওয়া মানে তার অধিকার হরণ করা।আকাঙ্ক্ষা বা বিলাসিতা (Wants):
চকোলেট, দামি খেলনা, নতুন ভিডিও গেম কিংবা অবান্তর কোনো আবদার, এগুলো হলো তার 'ওয়ান্টস'। এই জায়গাগুলোতে তাকে বুঝিয়ে অপেক্ষা শেখান। তাকে বোঝান, পৃথিবীর সব ইচ্ছা সাথে সাথে পূরণ হয় না। এখানে অপেক্ষা করাটা তার চরিত্রের দৃঢ়তা তৈরি করবে।যখন আপনি এই বিস্তারিত ব্যাখ্যাটা জানবেন না, তখন ওষুধের বদলে বিষ খাইয়ে ফেলার মতো অবস্থা হবে। ঠিক একইভাবে, আপনি কোথাও দেখলেন, সন্তানকে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে দিন। আপনি বিস্তারিত না জেনেই এটা করা শুরু করলেন। এখন ৫ বছরের একটা শিশু যদি শীতের রাতে আইসক্রিম খাওয়ার জেদ ধরে আর বলে “এটা আমার সিদ্ধান্ত”, আপনি কি তা মেনে নিবেন?
কিংবা আপনি দেখলেন, সন্তানকে কখনো শাসন করবেন না, বন্ধু হোন। আপনি শাসনের সীমারেখা না বুঝেই তার সব অন্যায় আবদারকে প্রশ্রয় দেওয়া শুরু করলেন। দিনশেষে দেখা গেল, সেই সন্তান বন্ধু হওয়া তো দূরের কথা, চরম খামখেয়ালী আর উচ্ছৃঙ্খল হয়ে গড়ে উঠছে।
আমার গ্রুপের অনেকেই মাঝে মাঝে একটু মন খারাপ করেন। একটু বিরক্ত হয়ে বলেন, স্যার, আপনার লেখাগুলো এত বড় কেন হয়? এত বড় লেখা পড়ার সময় কই? একটু ছোট করে দু-তিন লাইনে মূল কথাটা বলে দিলেই তো হয়!
আমি মৃদু হেসে মনে মনে ভাবি, হ্যাঁ, আমি চাইলেই তো খুব চটকদার, ছোট ছোট বাক্যে লাইক-কমেন্ট কুড়ানোর জন্য লিখতে পারি। কিন্তু ওই যে! আমি যদি মূল কথাটার গভীরে না গিয়ে, প্রেক্ষাপট এবং বিস্তারিত ব্যাখ্যা না করে আপনাকে শুধু ওপর-ওপর একটা আকর্ষক টিপস ধরিয়ে দেই আর সেই অপূর্ণ জ্ঞান নিয়ে আপনি যদি আপনার সন্তানের নরম মনে একটা চিরস্থায়ী আঁচড় কেটে বসেন, সেই দায় কি আমি এড়াতে পারব?
একটা শিশুর জীবন কোনো দুই মিনিটের নুডলস নয় যে ঝটপট তৈরি হয়ে যাবে। এটা একটা বটবৃক্ষ গড়ে তোলার মতো দীর্ঘমেয়াদী সাধনা। আর সাধনার পথ কখনো ছোট বা সংক্ষিপ্ত হয় না।
আমি চাই না আমার কোনো অপূর্ণ কথার কারণে কোনো একটি ঘরে একটি শিশু তার মা-বাবার ভুল বুঝাবুঝির বা ভুল এক্সপেরিমেন্টের শিকার হোক। লেখাগুলো দীর্ঘ হলেও, দিনশেষে যখন আপনারা এর গভীরে গিয়ে সন্তানকে সঠিকভাবে বুঝতে পারেন, পরম মমতায় তাকে বুকে টেনে নিতে পারেন, তখনই একজন মেন্টর হিসেবে আমার পরিশ্রম সার্থকতা পায়।
আসুন, সংক্ষিপ্ত দুই লাইনের টিপসের পেছনে না ছুটে, প্যারেন্টিং-এর পুরো বিজ্ঞানটাকে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর আলোকে জানার চেষ্টা করি। একটা বই, রিলসের একটা লাইন বা ভিডিও দেখে নয়, বরং তার পেছনের মূল দর্শনটাকে বুঝি।
আমাদের সন্তানেরা আমাদের ভুল সিদ্ধান্তের গিনিপিগ নয়; ওরা আমাদের জান্নাতের টুকরো। ওদেরকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে হলে আমাদের একটু কষ্ট করে, ধৈর্য ধরে বিস্তারিত জানতেই হবে।
#প্যারেন্টিং #positiveparentingtips #gentleparentingtips #momlife #fatherhood
